সম্পাদকীয়: ভূমিকম্প ঝুঁকি—বাংলাদেশের জন্য অগ্রাহ্য করার মতো সতর্কবার্তা নয়

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভবন ফাটল, হেলে পড়া কাঠামো এবং মৃত্যুর ঘটনা আমাদের আবারও কঠিন বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এটি কোনো হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া আশঙ্কা নয়; বরং বহু গবেষণা, পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের সতর্কতার ভিত্তিতে দাঁড়ানো এক বাস্তব চিত্র।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC 2020) এবং কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (CDMP)-এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ এলাকা উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং রংপুর—সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের USGS এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BUET) গবেষণায় বলা হয়েছে, দাউকি ফল্ট ও ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে সঞ্চিত চাপ থেকে ৮.০ থেকে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Lamont-Doherty Earth Observatory—র বিশ্লেষণ আরও উদ্বেগজনক। তাদের মতে, অঞ্চলে ইতোমধ্যেই ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্পের মতো চাপ জমে আছে।

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী ঢাকাই এই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু। CDMP–JICA ২০১৫ সমীক্ষায় আশঙ্কা করা হয়েছিল, ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে রাজধানীর প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং মারা যেতে পারে ১ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। রাজউকের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মানেনি; পুরান ঢাকার বহু ভবন কখনোই কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষার আওতায় আসেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল—সবখানেই দুর্বল স্থাপত্য ও নকশাগত অনিয়ম ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বাস্তবতা হলো—ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা; তবে অগোছালো নগরায়ন, অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ, নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির ঘাটতিই এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। পাঁচ মাত্রার নিচের ভূমিকম্পে ভবনের কলামে ফাটল কিংবা স্থাপনা হেলে পড়া বাংলাদেশের নগর কাঠামোর ভঙ্গুরতাই প্রমাণ করে।

এ অবস্থায় প্রয়োজন দৃঢ় পদক্ষেপ। BNBC 2020 কার্যকর করতে হবে কঠোরভাবে। ছয়তলার বেশি ভবনের জন্য নিয়মিত Structural Integrity Assessment বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে রেট্রোফিটিং কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। ঢাকার ভূ-প্রকৃতি ও লিকুইফ্যাকশন মানচিত্র হালনাগাদ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করাও সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায়ে মহড়া, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

আমরা জানি না বড় ভূমিকম্প কবে আসবে; কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—আমরা এখনো প্রস্তুত নই। বিজ্ঞানী, নগরবিদ ও পরিকল্পনাবিদদের সতর্কতা বারবার আমাদের সামনে এসেছে, কিন্তু আমাদের পদক্ষেপ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

আজকের ক্ষুদ্র ফাটলই হতে পারে আগামী দিনের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এখনই সময়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের—আমরা কি দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাব, নাকি ভবিষ্যৎকে এক বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেব?

ভূমিকম্প কাউকে হত্যা করে না—ঝুঁকিপূর্ণ ভবনই করে। বাংলাদেশ কি এই সত্যকে গুরুত্ব দেবে, নাকি আরেকটি ট্র্যাজেডির পর জেগে উঠবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

22 Nov 2025/Editor



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

RSS
Follow by Email