সব উন্নয়ন প্রকল্পে ‘প্ল্যানিং কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বিআইপির

সব উন্নয়ন প্রকল্পে ‘প্ল্যানিং কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বিআইপির

নগর দর্পণ ডেস্ক | ঢাকা | ২০ আগস্ট ২০২৬

দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমি ও জলাভূমি হ্রাস এবং বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে ‘প্ল্যানিং কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ (Planning Compliance Report) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।

টেকসই ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্থাটি সাত দফা রোডম্যাপ তুলে ধরেছে। এতে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদিত পরিকল্পনার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের সামঞ্জস্য যাচাই, কৃষিজমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ, নিয়মিত পরিকল্পনা পর্যালোচনা এবং একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিআইপির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনাগত সামঞ্জস্য যাচাইয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।

কী হবে ‘প্ল্যানিং কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’

বিআইপির প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি বিদ্যমান ও অনুমোদিত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা।

অর্থাৎ কোনো সড়ক, আবাসন, শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট এলাকার মাস্টার প্ল্যান, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিবহন পরিকল্পনা, পরিবেশগত সংরক্ষণ এলাকা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সেটি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতার পাশাপাশি এর পরিকল্পনাগত গ্রহণযোগ্যতাও প্রকল্প অনুমোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠবে।

বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনার পরিবর্তে সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা

বিআইপি মনে করছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করলে একই এলাকায় ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

এ কারণে জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে পেশাজীবী সংগঠনটি।

বিশেষ করে আবাসন, যোগাযোগ, শিল্প, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক অবকাঠামোর পরিকল্পনাকে একটি বৃহত্তর Spatial Planning Framework বা স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

কৃষিজমি ও জলাভূমি সুরক্ষায় গুরুত্ব

দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিজমি, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার চাপের মুখে রয়েছে। বিআইপির রোডম্যাপে এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত না হলে নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি কমে যাওয়া, জলাধার ভরাট, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।

এ কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু নির্মিত অবকাঠামো নয়, কৃষিজমি, নদী-খাল, জলাভূমি, বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিআইপি।

পাঁচ বছর পরপর পরিকল্পনা পর্যালোচনার প্রস্তাব

দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা, ভূমি ব্যবহার, অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এ কারণে পরিকল্পনাকে স্থির দলিল হিসেবে না দেখে নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিআইপি।

সংস্থাটি পরিকল্পনাগুলো প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনা করার প্রস্তাব করেছে।

এতে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি মূল্যায়নের পাশাপাশি নতুন বাস্তবতার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা ডাটাবেজ

বিআইপির রোডম্যাপে একটি শেয়ার্ড ন্যাশনাল প্ল্যানিং ডাটাবেজ বা সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা তথ্যভান্ডার তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

দেশের বিভিন্ন সংস্থা বর্তমানে ভূমি ব্যবহার, সড়ক, জনসংখ্যা, অবকাঠামো, পরিবেশ, ইউটিলিটি এবং অন্যান্য স্থানিক তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করে। এসব তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পাওয়া গেলে একই তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিকল্পনা সমন্বয় সহজ হবে।

বিশেষ করে GIS ও ভূ-স্থানিক তথ্যভিত্তিক একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার অনুমোদিত পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারের তথ্য দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে।

প্রকল্প অনুমোদন ব্যবস্থায় আসতে পারে নতুন মাত্রা

‘প্ল্যানিং কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বাধ্যতামূলক করা হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নতুন একটি স্তর যুক্ত হতে পারে।

বর্তমানে বড় প্রকল্পে কারিগরি, অর্থনৈতিক, আর্থিক, পরিবেশগত ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। বিআইপির প্রস্তাব কার্যকর হলে এর সঙ্গে প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

এতে পরিকল্পনার বাইরে অবকাঠামো নির্মাণ, অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রকল্প গ্রহণ এবং একই এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরস্পরবিরোধী প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নেও জোর

বাংলাদেশে বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলের জন্য মাস্টার প্ল্যান, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যানসহ বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিআইপির সাত দফা রোডম্যাপের মূল বার্তাও তাই শুধু নতুন পরিকল্পনা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্পের সঙ্গে পরিকল্পনার সামঞ্জস্য যাচাই, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিকল্পনা পর্যালোচনা—এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

দ্রুত নগরায়ণশীল বাংলাদেশের জন্য এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে উন্নয়ন প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্থানিক পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় বাড়ার পাশাপাশি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগর ও অঞ্চল গড়ে তোলার পথ আরও সুসংহত হতে পারে।

সূত্র: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)–এর সাত দফা রোডম্যাপ সম্পর্কিত প্রকাশিত প্রতিবেদন, ১৯ আগস্ট ২০২৬।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

RSS
Follow by Email