কাগজে নয়, বাস্তবায়নে যেতে হবে ‘জাতীয় নগর নীতি ২০২৫’: সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

নগর দর্পণ ডেস্ক | ঢাকা | ১৩ আগস্ট ২০২৬

দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এখন নগর এলাকায় বসবাস করছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে শহরগুলোর অবদান প্রায় ৬৫ শতাংশ। দ্রুত নগরায়ণের এই বাস্তবতায় পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল নগর গড়ে তুলতে ‘জাতীয় নগর নীতি ২০২৫’ (National Urban Policy 2025) দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন নগর উন্নয়ন খাতের নীতিনির্ধারক, পরিকল্পনাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

তাদের মতে, জাতীয় নগর নীতিকে শুধু একটি নীতিগত দলিল হিসেবে রেখে দিলে হবে না; দেশের নগর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

গত ১৩ আগস্ট ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘National Dissemination Workshop on National Urban Policy 2025’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ও স্থানীয় সরকার বিভাগ (LGD) যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে। এতে সহায়তা দেয় যুক্তরাজ্য সরকার।

দেশের প্রথম জাতীয় নগর নীতি

বাংলাদেশ সরকার দেশের পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল নগর উন্নয়নের জাতীয় কাঠামো হিসেবে জাতীয় নগর নীতি ২০২৫ অনুমোদন করেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে নীতিটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে গণপূর্ত অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। নীতি প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে UNDP এবং সহায়তা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার।

কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে জাতীয় নগর নীতি তুলে ধরা এবং NUP 2025 Implementation Action Plan প্রণয়নের জন্য তাদের মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করা।

নগর উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়

কর্মশালায় নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহমুদ আলী বলেন, নগর উন্নয়ন কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব হতে পারে না।

এর জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতের মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী এবং নগরের বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

এই বক্তব্য বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। বর্তমানে নগরের ভূমি ব্যবহার, সড়ক ও যোগাযোগ, পানি ও স্যানিটেশন, আবাসন, পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভক্ত।

জাতীয় নগর নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

‘নীতি থেকে এবার বাস্তবায়নে যেতে হবে’

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. সামসুল ইসলাম বলেন, এখন মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া।

তিনি বলেন, জাতীয় নগর নীতি ২০২৫-কে শুধু একটি নীতিগত দলিল হিসেবে না রেখে নগর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবা প্রদানে বাস্তব পরিবর্তনের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে।

এর মাধ্যমে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং অন্যান্য নগর এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় দিকনির্দেশনা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে নীতির সংযোগ জরুরি

UNDP বাংলাদেশের সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট তানভীর মাহমুদ বলেন, জাতীয় নগর নীতির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দেশের শহরগুলোতে এটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।

জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত নির্দেশনার সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং স্থানীয় অগ্রাধিকারের সংযোগ ঘটানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, নীতি বাস্তবায়নের নেতৃত্ব ও মালিকানা সরকারের হাতেই থাকা প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন সহযোগীরা কারিগরি জ্ঞান, গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ, উদ্ভাবন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহায়তা করতে পারে।

দ্রুত নগরায়ণ তৈরি করছে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ নগর এলাকায় বসবাস করে। একই সঙ্গে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে শহরগুলোর অবদান প্রায় ৬৫ শতাংশ

ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নগরগুলোর ভবিষ্যৎ সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে আবাসন সংকট, যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, জলাভূমি ও কৃষিজমি হ্রাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মতো সমস্যাও বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় জাতীয় নগর নীতি দেশের নগরগুলোকে একটি অভিন্ন উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আনার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাস্টার প্ল্যান ও স্থানীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ

জাতীয় নগর নীতি বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে জাতীয় পর্যায়ের নীতির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনার কার্যকর সংযোগ তৈরি করা।

দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্য মাস্টার প্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

জাতীয় নগর নীতির উদ্দেশ্য বাস্তবে অর্জন করতে হলে এসব পরিকল্পনার সঙ্গে অবকাঠামো বিনিয়োগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

বিশেষ করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল জেলা ও উপজেলা শহরগুলোর ক্ষেত্রে আগেভাগে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, পরিবহন নেটওয়ার্ক, আবাসন, খোলা জায়গা, জলাশয় এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু সহনশীল নগর গড়ার ওপর গুরুত্ব

জাতীয় নগর নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে Climate-Resilient Urban Development

বাংলাদেশের শহরগুলো বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভূমি ব্যবহার ও অবকাঠামো পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়—প্রাকৃতিক খাল, জলাধার, জলাভূমি, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংরক্ষণকেও নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সামনে বড় কাজ ‘Implementation Action Plan’

জাতীয় নগর নীতি অনুমোদনের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে এর Implementation Action Plan বা বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।

এই কর্মপরিকল্পনায় কোন প্রতিষ্ঠান কোন দায়িত্ব পালন করবে, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে সমন্বয় হবে, কী ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, অর্থায়নের ব্যবস্থা কী হবে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল তৈরি এবং তথ্য ও GIS-ভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার বিষয়টিও বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নীতিকে দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ দেওয়াই এখন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের নগর উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগত সমন্বয়, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

জাতীয় নগর নীতি ২০২৫ এসব সমস্যা সমাধানে একটি জাতীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে নীতির লক্ষ্যগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি, প্রকল্প, বাজেট ও স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রমে রূপান্তর করা যায় তার ওপর।

কর্মশালায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাকিল আখতার জাতীয় নগর নীতি ২০২৫ উপস্থাপন করেন। পরে নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট টিম লিডার নাথানিয়েল স্মিথ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আরবান স্পেশালিস্ট অমিত দত্ত রায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফওজিয়া ফারজানা এবং UNDP-এর যুগেশ প্রধানাংসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নগর উন্নয়ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জাতীয় নগর নীতি এখন অনুমোদিত। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরবর্তী বড় পরীক্ষা হলো—নীতির লক্ষ্যকে বাংলাদেশের শহর ও নগরবাসীর জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ দেওয়া।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

RSS
Follow by Email