ভবানীগঞ্জে ড্রেনেজ সংকট, সুপেয় পানির ভরসা নলকূপ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির (IUGIP) আওতায় রাজশাহীর খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের ভবানীগঞ্জ পৌরসভার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, নাগরিক জীবনের দুই মৌলিক সেবা, পানি নিষ্কাশন ও সুপেয় পানি সরবরাহে পৌরসভায় রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। মাঠ পর্যায়ের জরিপ, প্রকৌশল বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই সমীক্ষায় সমস্যার কারণও চিহ্নিত করা হয়েছে।
পৌর এলাকার আয়তনের তুলনায় ড্রেনের সংখ্যা খুবই কম। কোনো কোনো ওয়ার্ডে তো ড্রেনই নেই, বাসিন্দারা সেখানে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির খাল ও পুকুরের ওপর নির্ভর করেন। পৌর এলাকার প্রধান সড়কগুলোর পাশেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ড্রেন নেই, ফলে বৃষ্টির পানি জমে থেকে সড়কের পিচ ও কংক্রিট দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেসব ড্রেন আছে, সেগুলোরও আকার প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। এর ওপর পলি জমা এবং যত্রতত্র ফেলা বর্জ্যের কারণে ড্রেনের আসল পানি ধারণক্ষমতা আরও কমে গেছে। প্রকৌশল বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতে অধিকাংশ ড্রেনই বাড়তি পানির চাপ সামলাতে পারে না, ফলে আশপাশের এলাকায় পানি জমে যায়।
ড্রেন পরিষ্কারের কাজটি এখনো মূলত অভিযোগ পাওয়ার পরই করা হয়, নিয়মিত কোনো পরিকল্পনা মেনে হয় না। এতে শহরের প্রাণকেন্দ্রের ড্রেনগুলো যতটা যত্ন পায়, দূরের এলাকার ছোট ড্রেনগুলো ততটা পায় না। পাশাপাশি গুমানী নদী ও তার সঙ্গে যুক্ত খালগুলোতেও দখল আর পলি জমার কারণে পানি নামার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পুরো পৌরসভায় পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য আছে মাত্র একটি স্লুইস গেট, ফলে নদীর পানি বাড়লে তা ড্রেনের পানি বের হতে বাধা দেয় এবং জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ভবানীগঞ্জ পৌরসভায় পানি সরবরাহের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এখনো কোনো পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ পরিবার খাবার পানির জন্য গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল, আর একটি বড় অংশ ব্যবহার করে অগভীর নলকূপ, যা দূষণের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। খুব সামান্য কিছু পরিবার পুকুর বা অন্য উৎসের পানির ওপর নির্ভর করে। বরেন্দ্র অঞ্চলের দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নামছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ মিটার নিচে নেমে যায়, যদিও বর্ষার ভরা মৌসুমে তা ৬-৯ মিটারে উঠে আসে। এই তীব্র ঋতুভিত্তিক ওঠানামা গভীর নলকূপের উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পাম্প পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জলাধার নিঃশেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় সামনের দিনে পানির চাহিদা আরও বাড়বে, কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে সেই চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। অনেক বাসিন্দা আবার পাইপলাইন সংযোগের চেয়ে নিজের বাড়িতে নলকূপ বসাতেই বেশি আগ্রহী, আর পৌরসভার পক্ষ থেকেও পাইপলাইন সংযোগ নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কোনো নিয়ম নেই।


